আমাদের অধিকাংশের জীবনেই একবার না একবার অষ্টমীর ছোঁয়া হৃদয় স্পর্শ করেছে। হয়ত সে প্রেম, ভালোবাসা কিংবা ভালোলাগা পরিণতি পায়, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ পায় না, বিজয়ার সাথে সাথে বিলীন হয়ে যায়।

সদ্য ব্রেকআপ হয়েছে ঈশিকার, যদিও ক্যাজুয়াল রিলেশান ছিল, তবুও ঈশিকা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না যে অর্ণব ওকে ডাম্প করেছে। ওর মতো সুন্দরী, ওয়েল এডুকেটেড স্মার্টকে কী করে ডাম্প করে? কিছুতেই ঈশিকা ভুলতে পারছে না।

দিশা অনেকবার বুঝিয়েছে, দুইদিন পর তো তুইই ওকে ডাম্প করতিস, ইশু! অর্ণব না হয় আগে করছে, তাতে সমস্যা কোথায়? দিশা বুঝতে পারছে না যে ঈশিকা সেনকে কেউ কখনো ডাম্প করেনি। আর ওই সস্তার মিউজিশিয়ান ওকে ডাম্প করলো, কিছুতেই ওকে ছাড়বে না, এর বদলা ও নেবেই নেবে।

দিশা জানে-এর পরিণতি খুব ভালো হবে না। ছোটো থেকে ঈশুকে চেনে, একদম নার্সারি থেকে। ঈশুর জেদ তখন থেকেই পরিচিত। সব সময় না বলার আগেই সব পেয়ে গেছে, খুব আদুরে যাকে বলে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম গ্রহণ করা। বাবা মা এর একমাত্র মেয়ে। দাদু ঠাকুমার নয়নের মণি। যখন ঈশু জন্ম গ্রহণ করেছিল তখন সবাই মন খারাপ হলেও, ওর সুন্দর মুখ দেখে সবার ছেলে না হওয়ার দুঃখ কোথায় যেন বিলীন হয়ে যায়। ওর রূপের আলোক সৌন্দর্য এমনিই ছিল, সবার রাগ, অভিযোগ, অভিমান নিমিষেই বিলীন হয়ে যায়।

আদরে আদরে ওর জীবন কাটছিল। ওর জেদ যে ক্রমশ ভয়ংকর রূপ ধারণ করছিল তা অরুনিমা দেবী বুঝতে পারছিল। ঈশুর বদমেজাজি অহংকারী হওয়ার কারণ যে তারা সেটাও খুব ভালো করে জানে অরুনিমা দেবী। পেশায় তিনি একজন শিক্ষিকা। ছোটো থেকেই ঈশুর সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেনি।

ঈশুর যখন সব থেকে বেশি প্রয়োজন ছিল তখনই অরুনিমা দেবী পাশে ছিল না। এমন কী ওর বাবা আকাশ সেন, সে তো কখনো জানতেই চাননি ঈশু কেমন আছে? কী করছে? আকাশ সেন ভাবতেন, জীবনে টাকাই সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ছোট্ট ঈশুর তখন দামি বার্বি ডল কিংবা ভিডিও গেম কিংবা দামি ফেয়ারি ড্রেসের প্রয়োজন ছিলো না। তার প্রয়োজন ছিলো আকাশ বাবু এবং অরুনিমা দেবীর ভালোবাসার,একটু সময়ের কিন্তু সেই সব কিছুই হয়নি। বরং যখন আকাশ বাবু এবং অরুনিমা দেবী ঈশুর সাথে কথা বলতেন তাকে শুধু ভালো নম্বর আর কী করে হাই সোসাইটিটে মেইনটেইন করতে হবে, সে সব নিয়ে কথা বলত ।একদিনের জন্যও ঈশু কে বুঝতে চায়নি। তাতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল ঈশু।

ঈশুর বন্ধুদের সংখ্যা বেশি ছিলো না হতে গোনা কয়েকজন। আর সত্যি তো, ওইরকম বদমেজাজি অহংকারী মেয়ের বন্ধু কে বা হবে? একমাত্র দিশা যে তিন বছর বয়স থেকে এখনও পর্যন্ত ঈশুর সাথে আছে। সমস্ত কিছু মুখ বুঝে সহ্য করে কারণ একমাত্র দিশাই ওই কঠোর, অহংকারী, বদমেজাজি, অসভ্য আচরণের মধ্যেও একটি নিষ্পাপ ,পরিষ্কার ,সৎ আর দুর্বল মন দেখেছে । সেটা হয়ত ঈশুও জানে না। তাই হয় তো দিশা ঈশুর সমস্ত ভুলগুলোকে ছেলেমানুষি ভেবে অদেখা করে দেয়।

এদিকে পুজোর ছুটি ও পড়ে গেছে। দিশার সমস্ত শপিং কম্পিলিট । এবার একটু বেশিই এক্সসাইটেড দিশা। কারণ ওর আর কিগান-এর প্রথম দুর্গা পুজো এটা, অনেক প্ল্যান করেছে দুজনে। কিন্তু সবটাই কিগানের পাড়াতেই। ওদের পাড়ার পুজোটা বেশ জাঁকজমক করেই হয়। আর দায়িত্বেও আছে সব মিলিয়ে এবারের পুজোটা দিশা আর কিগান এর কাছে খুব স্পেশাল । দিশার কোনো অসুবিধা নেই, কারণ কিগান ঈশুদের পাড়াতেই থাকে । তবে ঈশু এখনো ব্যাপারটা জানে না। জানলে হয়ত একটু চিৎকার করবে ,অভিমান করবে, এত দিন কেনো বলি নি। তবে পাঁচ মিনিটে ঠিক হয়ে যাবে।

এক পাড়াতে থাকলেও ঈশু কিগান কে ঠিকঠাক চেনে না, হয়ত দু একবার দেখেছে, তবে চেনা না এটা বলাই ভালো। নিজের মধ্যে এতটাই বিভোর থাকে ঈশু যে আসে পাশে কে আছে সেটা লক্ষ্যই করে না।

দিশা ঠিক করেছে সাহস করে ওর আর কিগান এর কথা বলবেই। আর ওদের দুর্গা পূজার প্ল্যানটাও সব ঠিক আছে। কিন্তু ঈশু দুর্গাপূজার ব্যাপারটা মানবে না, এটা দিশা খুব ভালো করেই জানে। তবে চেষ্টা তো একবার করবেই। যতোই হোক ঈশুর বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কথা ,এত বছরে ঈশুর সাথে থেকে কিছুটা তো শিখেছে।

যথারীতি মহালয়ার দিন দিশা ঈশুর বাড়ি এসে হাজির। অরুণিমা দেবী ও আকাশ বাবুকে প্রণাম করেই ঈশুর রুমে গেলো। গিয়েই কিগান আর ওর রিলেশান এর কথা জানালো। জানাতেই ঈশু প্রথমে একটু ভাব নিয়ে বললো ..বাহ! একবারে কার্ড নিয়ে এসে জানাতিস, এত তাড়াতাড়ি কেন বলছিস রে দিশু? দিশা পরিস্থিতি সামলে নিয়ে বললো, আমি নিজেই সিওর ছিলাম না রে, ক্যাজুয়াল ছিল কিন্তু কি থেকে যে কি হলো। বুঝলাম না রে!

তৎপর মান অভিমান-এর পালা শেষ হয়ে গিয়ে প্রথম থেকে সব বললো দিশা। যখনই শুনল দুর্গা পুজোর প্ল্যান আর সেখানে ঈশুর থাকতে হবে তখনই ঈশুর মাথাটা চট করে বিগরে গেলো। তারপরই দিশার প্ল্যান মাফিক নেকি কান্না শুরু। আর দিশা জানে এই চোখের জলে ঈশুর মন গলবেই। কান্না করতে করতেই বললো, এবার তো দেখ অষ্টমীর দিনই তোর বার্থডেটা পড়লো, এইবার আঠারোতম জন্মদিনটা আমরা খুব ভালো করে পালন করব, দারুণ হবে ব্যাপারটা। অষ্টমীর দিনই তুই এই জগতে এসেছিস, আর এবারও সেই দিন। এবার তোর সাথে ইন্টারেস্টিং কিছু ঘটবে দেখিস, বলেই আড় চোখে ঈশুর দিকে তাকালো মজার ভঙ্গিতে ,তারপর স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো।

দিশা বুঝতে পারলো ঈশু রাগ রাগ চোখে দেখছে, এক্ষুনি হয়তো বাড়ি থেকে বের করে দেবে!কিছু না ভেবেই আবার দিশাকে চেপে জড়িয়ে ধরে বললো, প্লিজ, আমাকে হেল্প কর তুই ছাড়া আর কে আছে? এই প্রথম কিছু চাইছি, প্লিজ মানা করিস না !এবার দুর্গা পূজাটা একটু অন্য রকমভাবে উপভোগ করি! প্লিজ ঈশু ! প্লিজ!

অনেক ভেবে বললো, ঠিক আছে তবে কিন্তু বার্থডে-এর ড্রামাটা কিন্তু আনিস না। আর বাদবাকি আমাকে বেশি জড়াবি না। ওই সব ড্রামা আমার পোষাবে না, তুই সেটা ভালো জানিস। ঈশু কত গুলো নিয়ম বিধি শুনিয়ে দিলো, দিশা সেই সব শুনছিল না, স্বপ্ন জগৎ হারিয়ে গেলো সে, খোঁজ আর কারো ছিল না।

যথারীতি ষষ্ঠীর সকাল এ লাল কুর্তি পরে বেশ সেজে গুঁজে ঈশুর বাড়ি হাজির হলো, ঈশু রেডি হচ্ছিল দিশা ডাকতেই ঈশু নেমে এলো।

দুজন ই পাড়ার মণ্ডপে গেলো, দিশা কিগান এর সাথে আলাপ করিয়ে দিলো ঈশুর। পাড়ার মণ্ডপে এর আগে কখনো এতটা সময় থাকেনি, বিরক্ত লাগছিল। কিন্তু কিছু করার নেই, বেস্ট ফ্রেন্ডের জন্য এইটুকু না করলে হবে না। বাধ্য হয়েই এইসব নেকি ড্রামা সহ্য করছে।

নিজের মনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা গুলো বলছিল, ঠিক তখনই ওর কাঁধে একটু সামান্য ধাক্কা লাগে, রেগে কটমট গলায় চিৎকার করে বলে, এসব 'nonsense ' মানুষ আর কি দেখে চলে না? চিৎকার এর আওয়াজ শুনেই দিশা আর কিগান এসে জিজ্ঞাসা করতেই ওদের কথা থামিয়ে ঈশু বলে বাড়ি গেলাম আমি,তুই কি যাবি?

কিগান শান্ত গলায় বললো, পুজো হয়ে গেছে, প্রসাদটা নিয়ে না হয় যাও। চুপ করে ছিল, রাগে ভিতরে ফেটে যাচ্ছিল ঈশুর। কটমট করে দিশাকে দেখছিল, দিশা এমন ভাব করলো যাতে কিছু হয়ই নি।

ঈশু রাস্তার কুকুর গুলোকে প্রসাদ খাওয়াচ্ছিল । তখন সৃজন-এর চোখ পড়লো ওই রাগী মেয়ে টার ওপর। হ্যাঁ আগেও দেখেছে, যতবারই দেখেছে ততবারই ওই অহংকারী বদমেজাজি রূপই চোখে পড়েছে । কখনো এই নরম সহৃদয় রূপ দেখে নি.... আজ হয়ত ওর এই রূপ ওকে আরো বেশি সুন্দর করে তুলেছে। রাস্তার কুকুর দের যে এই ভাবে ভালো বেশে যত্ন করে খাওয়াতে পারবে, ঈশিকার মত অহংকারী মেয়ে তা কখনোই সৃজন ভাবেনি।

হ্যাঁ, ঠিক ই ভাবছেন! সৃজন যে ১০ মিনিট আগেই ঈশুকে অজান্তেই ধাক্কা মেরে চলে গিয়েছিল, আর স্যরিটাও বলার প্রয়োজন মনে করেনি। একি পাড়ায় আছে কিন্তু কখনো কথা তো দূরের, কখনো ভালো করে দেখেনি। ঈশুর এই অহংকার কীসের তা আজ পর্যন্ত সৃজন বুঝে উঠতে পারেনি। ওর থেকেও কত সুন্দর মেয়ে আছে পৃথিবীতে, তবুও এত কীসের দেমাক কারো জানা নেই। তবে আজ এরকম রূপ দেখে সৃজন এর অজান্তেই ঈশুর প্রতি একটা ভালো লাগা এসেছে,যতটা খারাপ ভাবতো ততটা খারাপ নয়! নিজের মনেই হেসে উঠলো সৃজন।

সৃজন ভাবছিলো তাহলে কী এত দিন ভুল ভেবেছে! ভাবতে ভাবতেই কিগান পিছন থেকে ডাকলো সৃজনকে,দিশার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। ঈশু আবার নিজের রাগী সত্তা ধারণ করে নিয়ে এলো ।কিগান সৃজন এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল কিন্তু ঈশু মনে হলো ওদের পাত্তাই দিলো না ।

দিশাকে বললো তোদের ড্রামা শেষ হয়ে গেলে চল তাহলে! সৃজন ঈশুর কথা শেষ না করার আগেই বললো আমরা কি ওই কুকুর গুলোরও সমকক্ষ নই ম্যাডাম! ঈশু মুখ গম্ভীর করে বললো.. ওরা আপনাদের মতো কাউকে বিচার করে না ,আপনাদের মতো স্বার্থ নিয়ে ভালোবাসার ড্রামা করে না!

দিশা পরিস্থিতি কে সামলানোর জন্য বললো, কিগান তাহলে আমরা আসি, চল ঈশু! সৃজন কাল তাহলে জমিয়ে আড্ডা দেবো বলেই ওরা দুজন চলে গেলো। সৃজন ঈশুর চলে যাওয়া দেখছিলো.. সাদা কুর্তি আর নীল প্রিন্ট এর পালাজো আসতে আসতে আকাশের সাথে যেন মিশে গেলো!