উফ! সকাল ৯টা বেজে গেল। এই মেয়েটা যে কবে নিজের দায়িত্বটা নিতে শিখবে, কে জানে! মেয়েটাকে বারবার বলা হয়েছে, এই কম্পিটিশনটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ওর ক্যারিয়ারের জন্য। সঠিক সময়ে না পৌঁছাতে পারলে সব কিছু বিগড়ে যেতে দেরি হবে না!
নিজে নিজে কথাগুলো বলে মলিনা দেবী পরির ঘরের দিকে যেতে লাগলেন।
পরিধি (পরি) প্রায় সারা রাত জেগে নিজেকে প্রিপেয়ার্ড করেছে কম্পিটিশনটার জন্য। পরি জানে, তার মা কতটা কষ্ট করে তাকে এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন। অ্যাট এনি কস্ট তাকে জিততেই হবে! মায়ের জন্য, শুধু মাত্র মায়ের জন্য।
এই ভাবতে ভাবতেই মায়ের আওয়াজ শুনতে পেল। জোরে চিৎকার করে বলল, "জাস্ট ১০ মিনিট সময় দাও। এক্ষুনি আসছি, সোনা মা।"
পরিধির বয়স যখন ১০ বছর, তখন পরেশবাবু ছোট্ট পরি আর মলিনাকে ছেড়ে তাঁর এক সুন্দরী অফিস-কলিগকে বিয়ে করে তাদের একা রেখে চলে যান। মলিনা দেবী তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করেননি একবারও।
তাদের দুজনের বিয়েটা ভালোবেসেই হয়েছিল। দুজনই একই কলেজে পড়াশোনা করার সুবাদে আলাপ হয়েছিল। আলাপটা যদিও পরেশবাবুই যেচে করেছিলেন। কারণটা বলতে গেলে সেই সময়ে ফিরে যেতে হবে।
এখনকার মধ্যবয়স্কা মলিনা দেবী তখন কলেজের সবার মুখে মুখে একটাই নাম—মলি। মলির গান শুনে সবাই সব সময় মুগ্ধ হয়ে যেত। আর এমন কোনো কম্পিটিশন ছিল না, যেখানে মলি সেকেন্ড হয়েছে। কলেজে সবার মুখে একটাই নাম—মলিনা সেন (মলি)।
সেই রকমই এক কলেজ ফেস্টে পরেশবাবু মলিনা সেনকে প্রথমবার দেখেছিলেন। বলা যায়, প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। যেমন দেখতে, তেমন সুন্দর গান গায়।
মলি গাইছিল—
প্রেমের জোয়ারে ভাসাবে দোঁহারে— বাঁধন খুলে দাও, দাও দাও দাও।
পরেশ নিজের মনেই সমস্ত বাঁধনগুলো যেন খুলে ফেলে দিয়ে মলির কাছে চলে যাচ্ছিলেন।
মলি গাইছিল—
"পাগল হে নাবিক, ভুলাও দিগবিদিক— পাল তুলে দাও, দাও দাও দাও॥"
পরেশ নিজেকে শান্ত করে নিয়ে স্টেজের কাছে যেতে লাগলেন। দূর থেকে দেখলেন, মলি স্টেজের বাইরে যাচ্ছে। কোনো মতে ভিড় ঠেলে পরেশ মলিনাকে (মলি) একটি হলুদ গোলাপ দিয়ে বললেন—
"আমি ফুল তুলিতে এলাম বনে— জানি নে, আমার কী ছিল মনে। এ তো ফুল তোলা নয়, বুঝি নে কী মনে হয়, জল ভরে যায় দু-নয়নে॥"
মলি কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাঁকে থামিয়ে পরেশবাবু বললেন, "নমস্কার, আমি পরেশ রায়। আমি কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। তুমি হয়তো আমাকে দেখোনি, চেনো না। তবে তোমাকে আমি খুব ভালো করে জানি। তুমি মলিনা সেন, মিউজিক ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী। তোমার গানের গল্প আগে অনেক শুনেছি। তবে আজ নিজে শুনে মনে হচ্ছে, যত সুনাম-প্রশংসা করা যায়, সবটাই কম।"
এইভাবে পরেশ নিজের কথা বলেই যাচ্ছিলেন। তারপরই মলিনা পরেশকে থামিয়ে বলল, "ধন্যবাদ আপনাকে।"
আর কথা না বাড়িয়ে মলিনা চলে গেল।
পরেশ মলিনার চলে যাওয়া দেখছিলেন। তাঁর বুকে হালকা ব্যথা অনুভব হলো। মনে মনে নিজেই নিজেকে বললেন, "এই অহংকার একদিন আমার হয়ে যাবে। এই অহংকারকেই আমার করে নেব সারাজীবনের জন্য।"
পরিধি আকাশি রঙের একটা চুড়িদার পরে নিল। চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক, আর কপালে ছোট্ট কালো টিপ। চুল খোলা রাখতেই পছন্দ করে। হালকা সাজে তাকে অনন্যা লাগছে। আর আকাশি রঙে তাকে ভারী সুন্দর মানায়।
নিজেকে আয়নায় দেখছে আর মনে মনেই নিজেকে প্রস্তুত করছে। হঠাৎ ফোনের আওয়াজ তাকে মনে করিয়ে দিল, তার দেরি হয়ে যাচ্ছে। স্ক্রিনে নাম উঠে এল—একাংশ।
"হাই পরি, তুই রেডি তো! সব গুছিয়ে নিয়েছিস? দেখ, যেতে কিন্তু আমাদের ওই ৩০ মিনিট লাগবে। আমি ৫ মিনিটে তোর বাড়ির সামনে হাজির হয়ে যাব। তুই আর আন্টি কিন্তু দেরি করিস না!"
বলেই ফোনটা কেটে দিল। পরিকে কথা বলার সুযোগই দিল না।
একাংশ জানে, পরি ওকে ঠিক বারণ করবে—কেন নিজের কাজের ছুটি নিয়ে ওর সঙ্গে যাচ্ছে। পরি এই জন্য অনেকবার রাগ করে একাংশের সঙ্গে কথা বন্ধ রেখেছে। তাতে করে নিজেই কষ্ট পেয়েছে। শেষে গিয়ে মলিনা দেবী আর অনুরাধা দেবী তাদের ভাব করিয়েছেন।
অনুরাধা একাংশের মা, আর মলিনার স্কুলের বান্ধবী। পরেশ পরি আর মলিনাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অনুরাধাই প্রথম ওদের সাহায্য করেছে। হয়তো বন্ধুত্ব একেই বলে। না বললেও সব বুঝে নিয়ে এগিয়ে আসে, পাশে থাকে। কিছু কিছু বন্ধুত্ব হয়তো পরিবারের থেকেও বেশি কাছের হয়, যেমন অনুরাধা।
এমন নয় যে মলিনার পরিবার সাহায্য করতে চায়নি। মলিনা সাহায্যের হাত ফিরিয়ে দিয়েছিল। কীভাবে সবটা ভুলে যাবে?
একাংশ এসে গেছে। বার দুয়েক হর্ন দেওয়াও হয়ে গেছে। মলিনা দেবী ভীষণ এক্সাইটেড আজকের দিনটার জন্য। বলতে গেলে পরির থেকেও বেশি।
মলিনা দেবী বাইরে বেরোতে বেরোতে আবার চিৎকার করে বললেন, "কী রে, আর কতক্ষণ লাগবে? এবার তো আয়! একাংশ এসে দাঁড়িয়ে আছে তো! দেখ, ও আবার আমাদের পৌঁছে দিয়ে অফিসে যাবে। ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে।"
এই বলে মলিনা দেবী আর একাংশ দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন।
পরি বেরোতে বেরোতে বলল, "তা যখন এতই কাজের চাপ, তাহলে সিইও স্যার এলই বা কেন? ওকে কি আমি বলেছি?"
আরও কিছু বলবে, কিন্তু একাংশ তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে পরিকে বলল, "বাহ! তোকে তো আজ দারুণ লাগছে! রেগে গেলে দেখ, এখনো তোর নাকটা লাল হয়ে যায়।"
আরও কিছু বলবে, কিন্তু নিজের অনুভূতিগুলো যে এখনো প্রকাশ করার সময় আসেনি।
একাংশ পরিকে ছোটো থেকেই ভালোবাসে। সে নিজেও জানত না, বন্ধুত্ব থেকে যে ভালোবাসা হয়ে গেল, কতটা যে আপন হয়ে গেছে। পরির মন খারাপের কারণগুলো সব যেদিন মুছে ফেলতে পারবে, সেদিন একাংশ নিজের অনুভূতির কথা বলবে।
পরিকে আজ খুব সুন্দর লাগছে আকাশি রঙের চুড়িদার পরে। আকাশি রঙ তো একাংশের প্রিয়।
একাংশ গাড়ি চালাতে চালাতে পরিকে দেখছে। আন্টি পরিকে সব আরেকবার বুঝিয়ে বলে দিচ্ছেন। পরি ভীষণ চিন্তিত। ওর এই চিন্তিত মুখটাও যেন ভীষণ মায়ায় ভরা।
একাংশের ইচ্ছে হচ্ছে, পরির কপালের কালো টিপের পাশে ছোটো ছোটো ঘামের বিন্দুগুলো মুছে দিয়ে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলতে—"কোনো চিন্তা নেই। তুমি পারবে। আমার পরিই জিতবে।"
সব ভাবনার ব্যাঘাত ঘটিয়ে দিয়ে পরি বলল, "একাংশ, তুই আমাদের গেটে নামিয়ে দিয়েই চলে যাস। তোর আর ভিতরে যেতে হবে না।"
কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই অসময়ের কালো মেঘ একাংশের মনে বাসা বেঁধে ফেলল।
পরি এখানেই থামেনি। আরও বলল, "দেখ, তুই আমার জন্য এইভাবে তোর কাজের ক্ষতি করিস না।"
পরি জানে, এই কথাগুলো কেন বলছে। আর কথাগুলো বলে যে সে একাংশকে কতটা কষ্ট দিচ্ছে, সেটাও জানে।
কথাগুলো বলতে বলতেই মলিনা দেবী পরিকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "একাংশ, তুমি ওর কথাতে কিছু মনে কোরো না। জানোই তো, ও টেনশনে এসব ভুল বকে।"
ততক্ষণে একাংশের মন ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ কেন পরি এতটা অচেনা হয়ে উঠছে ওর কাছে? কেন পরি এভাবে ওকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে? তাহলে কি পরি ওর মনের কথাগুলো বুঝে নিয়ে ওকে আর বন্ধু বলেও ভাবতে পারছে না?
ভাবতে ভাবতেই "সুরের আসর"-এর সেটে চলে এল একাংশ। আর ভিতরে গেল না। মলিনা দেবী অনেকবার বললেন, তাও গেল না। গাড়ি থেকেই পরিকে "বেস্ট অফ লাক" বলে বেরিয়ে গেল।
পরির মনে কোথাও একটা খারাপ লাগা এসে ভিড় করল। কিন্তু তা কিছুক্ষণের জন্যই। চারিদিকে আলো, এত টেনশন, এক্সাইটমেন্ট—সমস্ত খারাপ লাগাকে উড়িয়ে দিল।
"সুরের আসর"-এর মঞ্চে সবাইকে স্বাগত জানাই—
এই বলে সমস্ত প্রতিযোগীর নাম ধীরে ধীরে ডাকা হলো। তারপর ডাক পড়ল পরিধি সেনের।
পরি ভীষণ ঘাবড়ে গেছে। একটু কাঁপতে কাঁপতে নিজেকে সামলে স্টেজে উঠে সবাইকে প্রণাম জানাল। তারপর চোখ বন্ধ করে নিজেকে বলল, "তুই পারবি।"
হঠাৎ একাংশের মুখটা সামনে এল। একাংশ বলছে, "পরি, তুই আমার পরি। তুই তোর বেস্ট দিবি। আই নো, তুই ভালো করবি। আমাদের বিশ্বাস, তুই পারবি।"
পরির এক মুহূর্তে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এই ছেলেটা আমার ভাবনাতেও চলে এল! এই তুই যা! এখনো কেন তুই?
একাংশ এখানেও পরিকে বকে বলছে, "চুপ কর। জাস্ট স্টপ অ্যান্ড ব্রিদ... অ্যান্ড ইউ উইল?"
পরি নিজের মনেই বলল, "উই উইল গট দিস..."
ও যে মানে না মানা।
আঁখি ফিরাইলে বলে, "না, না, না।"
যত বলি 'নাই রাতি— মলিন হয়েছে বাতি'
মুখপানে চেয়ে বলে, "না, না, না।"
বিধুর বিকল হয়ে খেপা পবনে ফাগুন করিছে হা-হা ফুলের বনে।
আমি যত বলি তবে, এবার যে যেতে হবে, দুয়ারে দাঁড়ায়ে বলে, "না, না, না।"
গান শুনে সব জাজ এবং দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মলিনা দেবীর চোখে খুশির অশ্রুধারা বয়ে পড়ছে।
পরি ছুটে মায়ের কাছে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে কিছু বলতে যাবে, কিন্তু পারল না। মলিনা দেবীও খুশিতে কিছু বলতে পারছেন না।
মঞ্চ থেকে ডাক পড়ল—
"সুরের আসর" প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে পরিধি সেন।
এই দিনটার অপেক্ষাতেই ছিল মলিনা দেবী আর পরিধি।
মলিনা দেবী যা করতে পারেননি, তাঁর মেয়ে, তাঁর পরি করে দেখিয়েছে। আজ হয়তো তাঁর জিত হয়েছে। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। পরি স্বপ্ন পূরণ করেছে। অনেক কষ্টের ফল আজ পেয়েছে। অনেক অবহেলার উত্তর আজ দিতে পেরেছে।
মলিনা দেবীর গানের স্কুল থেকে ফোন আসছে। তাঁর কলিগরা অভিনন্দন জানাচ্ছেন।
পরি ভীষণ খুশি।
কিন্তু একাংশ!
একাংশ যে একবারও ফোন করল না!
তাহলে কি পরি ওকে খুব আঘাত দিয়ে দিল?
মনে মনে নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছে। বিরক্ত লাগছে। কেন তখন এতগুলো কথা শোনাল!
আর একাংশ তো এত বুঝদার! ও তো ফোন করতে পারত।
এদিকে অনুরাধা দেবী ফোন করে সব প্ল্যান রেডি করে নিয়েছেন। আজ ছোট্ট করে একটা সেলিব্রেশন হবে। পরে যা হবে, পরে ভাবা হবে।
পরির তবুও ভালো লাগছে না। একাংশ এতটা রেগে গেল যে একটা ফোন পর্যন্ত করতে পারল না?
পরি নিজের অনুভূতিকে কন্ট্রোল না করতে পেরে অনুরাধা দেবীকে বলল, "আন্টি, একাংশ কোথায়?"
অনুরাধা দেবী শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, "ও তো অফিসেই।"
পরি আর কিছু না বলে মলিনা দেবীর হাতে ফোনটা দিয়ে দিল।
পরি বেরিয়ে যাচ্ছে। মলিনা দেবী লক্ষ্য করলেন পরির এই অন্যমনস্কতা।
পরি বাড়ি ফেরার পথে কোনো কথা বলল না। চুপ করে রইল। ও বুঝতে পারছে না, ওর সঙ্গে ঠিক কী হচ্ছে!
কেন স্টেজে ওর নিজের ভাবনায় একাংশ এল?
একাংশ তো যাওয়ার পর একবারও ফোন করল না। আর ও যে আসবে, এই ভাবাটাও তো বেকার!
আর পরি তো নিজেই ওকে বারণ করেছে। তাহলে কেন আসবে?
তাছাড়া একাংশকে তো প্রথম কিছুর জন্য বারণ করা হয়নি! কই, আগে তো এত বারণ শোনেনি! এখন কেন এত বাধ্য হয়ে গেল?
যাক, ভালোই হয়েছে। পরিরও আর কাউকে প্রয়োজন নেই।
পরি কেন মন খারাপ করছে ওই একাংশের জন্য, যে ওকে একবার কনগ্র্যাচুলেট পর্যন্ত করল না?
কথাগুলো নিজের মনে মনে বলল।
বাড়ি ফিরে দেখল, সবাই খুব খুশি। দিদুন, দাদুভাই—সবাই হাজির।
দিদুন কান্না মেশানো স্বরে বললেন, "জানিস দিদিভাই, তুই যখন ছোটো ছিলিস, তখন থেকেই মলি (মলিনা দেবী) তোর জন্যই বেঁচে আছে। তোর বাবা যখন ছেড়ে..."
কথাটা শেষ না করতে দিয়ে মলিনা দেবী বললেন, "থাক না মা, পুরোনো কথা।"
মলিনা দেবী পরিকে বললেন, "ফ্রেশ হয়ে নে। আমাদের তো আবার অণুদের (অনুরাধাদের) বাড়ি যাওয়ার কথা আছে।"
পরি বলল, "যেতেই হবে? কিছু বলে ক্যানসেল করা যায় না?"
মলিনা দেবী বললেন, "অনেক শখ করে ইনভাইট করেছে। আর তোর জন্যই তো। তুইই না গেলে কী করে হবে বল তো?"
পরি মুখ কাঁচুমাচু করে রুমে চলে গেল।
প্রায় সন্ধ্যা তখন।
মলিনা দেবী রেডি হয়ে পরির ঘরে ঢুকলেন। দেখে ঘর অন্ধকার করে পরি শুয়ে আছে। মলিনা দেবী কিছু বুঝতে পারলেন, কিন্তু বললেন না। শুধু বললেন,
"কী রে, তোর কী শরীর খারাপ করছে?"
পরি আবছা স্বরে বলল, "না মা, কিছু হয়নি।"
মলিনা দেবী কাছে গিয়ে বসলেন। পরির মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
"তুই খুশি না? এটা তো স্বপ্ন ছিল, বল! কী হয়েছে? মাকে বলবি না?"
মলিনা দেবী বুঝতে পেরেও পরির মুখ থেকে সবটা শুনতে চাইছিলেন।
কিন্তু পরি বলল,
"না মা, কিছু হয়নি। ভীষণ টায়ার্ড লাগছে। লো ফিল হচ্ছে, এই যা..."
নিজেকে স্বাভাবিক রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পরি। কিন্তু মায়ের কাছে কী লুকোনো সম্ভব হয়?
আর ও তো নিজেও জানে না, কী চাইছে। কেন এত অস্থির লাগছে!
মলিনা দেবী শান্ত স্বরে বললেন,
"হ্যাঁ, ক্লান্তি তো আসবেই। আমাদের সবার জীবনেই আসে। কিন্তু তা তো আমাদের কারণেই আসে, তাই না? তাই আমাদেরই দূর করতে হবে।
অনেক সময় আমরা অনেক বেশি কাজ করে ফেলি। বিরতি নেওয়ার সময় পাই না। আবার আমরা নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে পড়ি—যে যুদ্ধের কোনো কারণই নেই। আমরা নিজের মনের সঙ্গেই নিজের দ্বন্দ্ব চালাই।
আর তারপর যখন বুঝি, এই যুদ্ধের কোনো কারণ নেই, আর নিজেই হেরে যাই, তখনও ক্লান্তি আসে। আর তখন আমাদের বিরতি নিতে হয়। একটু থমকে দাঁড়িয়ে সব আবার প্রথম থেকে ভাবতে হয়।
আমরা কিছু ভুল করছি না তো?
নিজেকে নিয়ে এত বেশি ভাবতে ভাবতে আমাদের যে ভালো চায়, তাকে আমরা কষ্ট দিচ্ছি না তো? নিজের কঠিন কথায় কিংবা তাকে অসম্মান করে ফেলছি না তো?
পরি, আমরা সব সময় ছোটো থাকি না। আগে যে কথা সহজে বলে দেওয়া যেত, তা সব সময় সহজে বলা যায় না।
পৃথিবীতে যত সম্পর্ক টিকে আছে, তার ভিত গড়ে ওঠে একে অপরকে সম্মান করা, বিশ্বাস আর ভালোবাসা থেকে..."
পরি কথাগুলো শুনে কেঁদে ফেলল।
মলিনা দেবী মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
"আন্টি কিন্তু এবার খুব রেগে যাবে। অনেক দেরি কিন্তু হয়ে গেছে। এবার রেডি হয়ে নে।"
ওলো সই, ওলো সই,
আমার ইচ্ছা করে তোদের মতন মনের কথা কই।
ছড়িয়ে দিয়ে পা দুখানি, কোণে বসে কানাকানি, কভু হেসে কভু কেঁদে চেয়ে বসে রই।।
অনুরাধা দেবী আর মলিনা দেবী দুজনে গান গাইতে গাইতে তাদের পুরোনো দিনের কথা ভাবছেন। দুজনের চোখের কোণেই জল।
এই গানটা তাদের খুব প্রিয়। আগে দুজনের মন খারাপ হলেই জড়িয়ে ধরে গান গাইতেন।
আর তারা এখন সংসারে এসে নিজেদের সেই দিনগুলো যেন আস্তে আস্তে মরচে পড়তে দেখছেন। কিন্তু তবুও তারা বেঁচে আছেন।
চুলে হালকা পাক লেগেছে। কিন্তু মন এখনো সেই উনিশ বছরের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে আছে—তাদের ভালোবাসার গান আর রবিঠাকুরের কবিতা গানে গানে।
পরি দেখল মা আর আন্টির চোখের জল।
সে নিজেই গান ধরল—
ওলো সই, ওলো সই,
তোদের এত কী বলার আছে ভেবে অবাক হই।
আমি একা বসি সন্ধ্যা হলে, আপনি ভাসি নয়নজলে, কারণ কেহ শুধাইলে নীরব হয়ে রই।।
অনুরাধা দেবী উঠে এসে পরিকে জড়িয়ে নিলেন।
কিছু মুখে প্রকাশ করতে আর হলো না।
অনেক সময় আমরা কিছু না বলেও আমাদের একে অন্যের প্রতি যে স্নেহ-ভালোবাসা, তা অবলীলায় বুঝিয়ে দিই। তখন আমাদের ভাষাও কম মনে হয় এই অনুভূতিগুলোর কাছে।
তেমনই অনুরাধা দেবী পরিকে নিজের বুকে আঁকড়ে ধরলেন। তার মধ্যে অনেক ভালোবাসা আর স্নেহ জড়িয়ে ছিল।
একাংশ অনেকক্ষণ হলো এসেছে। দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
পরিকে দেখে নিজেকে এক পলকে হারিয়ে ফেলতে পারে। নিজেকে আটকে রাখা যায় না। ভালো না বেসে থাকা বড্ড কষ্টের।
কিন্তু এই অবহেলা কিছুতেই সামলাতে পারছে না। আর একাংশ তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু পরিকে দেখে নিজের ভালোবাসাও তো লুকিয়ে রাখা অসম্ভব।
গোলাপি শাড়িটা পরে কী দারুণই না লাগছে! প্রবল বৃষ্টির পর যখন কালো মেঘগুলো আস্তে আস্তে সরে যায় আর হালকা সূর্য উঁকি দেয়, তখন যেমন পুরো পৃথিবীটা সুন্দর, প্রফুল্ল লাগে—ঠিক তেমন লাগছে।
সবসময়ের মতো খোলা চুল যেন সমুদ্রের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে।
আর এই শাড়িটা! এটা তো একাংশের পছন্দেরই। যদিও পরি জানে না। জানলে হয়তো পরত না।
এবারের দুর্গাপুজোতেই তো অনুরাধা দেবী শাড়িটা দিয়েছেন। একাংশই পছন্দ করে দিয়েছিল।
"কী রে, একাংশ, কখন এলি? চুপি চুপি আমাদের গান-গল্প শুনছিলি নাকি? তা দূরে কেন? আয়!"
আন্টির কথা শুনে পরি পিছু ফিরে দেখল।
একাংশ ওর দিকে তাকাল না। স্বাভাবিক গলায় বলল,
"না, এখন খুব ব্যস্ত। একটা আর্জেন্ট মিটিং আছে। আন্টি (মলিনা দেবী), পরে গল্প হবে। খুব ইম্পর্ট্যান্ট গো।"
অনেক কষ্টে বলেই বেরিয়ে গেল। পরির দিকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া কতটা যে কষ্টের, তা হয়তো পরি কখনো বুঝবে না।
পরি বুঝতে পারল, একাংশকে ও অনেক কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু একবারের জন্যও কী কথা বলা গেল না? একবার তাকালও না?
অনুরাধা দেবী বললেন, "কী রে, দুটিতে আবার ঝগড়া করলি নাকি?"
বলেই মলিনা দেবীকে বললেন,
"জানিস, পাপান (একাংশ)টা এখনো হিংসুটেটাই রয়ে গেল। যখন বললাম, আজ পরির পছন্দের খাবার সব রান্না হবে, অমনি নানা বাহানা দিতে লাগল। তখনই বুঝলাম, নিশ্চয়ই দুটিতে কিছু হয়েছে।"
পরি বুঝে গেল, একাংশ আর ওকে বন্ধু হিসেবে চায় না।
কিন্তু পরি এত কষ্ট কেন পাচ্ছে?
নিজেকে নিজে প্রশ্ন করছে বারবার। একাংশের মুখটা সামনে আসছে। আর যখন সামনে সত্যিই ছিল, তখন একটি কথাও নিজে বলল না। সকালের এই রকম ব্যবহারের জন্য তো ক্ষমাও চাইল না।
অনুরাধা দেবী আবার বললেন,
"কী রে পরি, কী হয়েছে? আমাকে বল তো। আমি ওকে বকে দেব। নিশ্চয়ই তোকে আবার জ্বালিয়েছে।"
মলিনা দেবী বললেন,
"আহ, ছাড় তো। ওদেরটা ওদেরই বুঝে নিতে দে..."
পরি চোখের জল আর নিজের অনুভূতি কিছুই আটকে রাখতে পারল না। দৌড়ে একাংশের রুমের দিকে ছুটল।
একাংশ গাড়িতেই একটা ফাইল ফেলে এসেছিল। সেটা আনতেই গিয়েছিল।
ফিরে এসে রুমে যেতেই পরির কান্নার আওয়াজ পেল।
একাংশের ভেতরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরির কাছে ছুটে চলে যেতে মন চাইছে। কিন্তু নিজেকেও শান্ত রাখতে হবে।
নিজেকে সামলে রুমে যাবে, তখনই শুনতে পেল কান্না মেশানো গলায় পরি বলছে—
"আমি জানি, আমি ভুল করেছি। তাই বলে একটি বার আমাকে ফোন করবে না? একটি বার আসবে না? এমনকি আমাকে দেখলে না পর্যন্ত? তোমার পছন্দ করা শাড়ি পরেছি, আর তুমি লক্ষ্য পর্যন্ত করলে না! এতটা রাগ?"
একাংশ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
পরি! ও জানে সব!
পরি বলছে,
"তাহলে কেন তখন আমার ভাবনায় এলে?"
পরি ডুকরে ডুকরে কান্না করতে করতে আরও বলছিল। কিন্তু একাংশের কানে আর কিছুই যাচ্ছিল না। চোখ দিয়ে জল বেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা কোনো কষ্টের জল নয়।
নিজেকে সামলে আস্তে আস্তে ঘরে গিয়ে পরির সামনে দাঁড়াতেই পরি ঝড়ের গতিতে সুকোমল হাত দুটোতে একাংশকে বন্ধনে বেঁধে ফেলল।
একাংশের হৃদয়ে হাজারখানা প্রজাপতি প্রায় একই সঙ্গে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে।
এটা সামলে নিয়ে কিছু বলতে যাবে, আর তখনই গোলাপফুলের পাপড়ি জোড়ার মতো দুটি ঠোঁট দস্যুর মতো এসে পড়ল। অবিরল অশ্রুধারা আর আবেগপূর্ণ চুম্বনে একাংশকে আবার বিস্মিত হওয়ার আর সুযোগ দিল না।
একাংশ একটু চমকে উঠে আরও শক্ত করে পরিকে ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধে ফেলল।
আস্তে আস্তে বলল,
"ভালোবাসিস আমাকে?"
পরি বলল,
"জানি না...."
একাংশ বলল,
"তাহলে ছাড়।"
একাংশ হাতটা ছাড়িয়ে দেবে, পরি আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বলল—
ওই মধুর মুখ জাগে মনে। ভুলিব না এ জীবনে, কী স্বপনে, কী জাগরণে॥ তুমি জান বা না জান, মনে সদা যেন মধুর বাঁশরি বাজে— হৃদয়ে সদা আছ বলে। আমি প্রকাশিতে পারি নে।
পরি মুখ তুলে একাংশের দিকে তাকিয়ে বলল—
"শুধু চাহি কাতরনয়নে॥"
একাংশ পরির চোখের জল মুছে দিতে দিতে বলল,
"একটা কবিতা শুনবি? তোর প্রিয় রবিঠাকুরের। অনেকবার প্র্যাকটিস করেছি, তোকে শোনাব বলে। আজকের দিনটার জন্য।"
পরি ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিল। তারপর বলল,
"মান রাখিস।"
অমনি একাংশ বলল,
"আবার তুই বলছিস! খানিক আগেই তো..."
পরি তখনও একাংশের বুকেই মাথা দিয়ে ছিল। হাত দিয়ে একটা মেরে বলল,
"এই, এবার কিন্তু..."
একাংশ হেসে বলল,
"আচ্ছা আচ্ছা, শোন।"
একাংশ আরেকটু শক্ত করে পরিকে জড়িয়ে ধরে আবৃত্তি শুরু করল—
তব স্পর্শ, তব প্রেম, রেখেছি যতনে— তব সুধাকণ্ঠবাণী, তোমার চুম্বন, তোমার আঁখির দৃষ্টি সর্ব দেহমন পূর্ণ করি—রেখেছে যেমন সুধাকর দেবতার গুপ্ত সুধা যুগ যুগান্তর আপনারে সুধাপাত্র করি; বিধাতার পূর্ণ অগ্নি জ্বালায়ে রেখেছে অনিবার। সবিতা যেমন সযতনে, কমলার চরণকিরণে যথা পরিয়াছে হার সু-নির্মল গগনে অনন্ত ললাট। হে মহিমাময়ী, মোরে করেছ সম্রাট।