দিনটা ছিল ২০ জুন.... কথায় আছে না, পুরাতনকে ভুলতে নতুনের আগমন চাই-ই চাই।
সেই রকমই হল গর্বিতার সাথে। সারাদিন ভাবল, এই বছর আর অভিনবকে উইশ করবে না। এবার মুভ অন করবেই। সেই ভাবতে ভাবতে Instagram স্ক্রল করছিল, তখনই চোখ পড়ল Tinder নামক একটি ডেটিং অ্যাপে। তারপরই ইনস্টল করল।
রাইট-লেফট করতে বেশ মজা পাচ্ছিল। ভালো লাগছিল। হঠাৎ দেখল, ফোনের স্ক্রিনে ১২ A.M.
আজ ২১ জুন, অভিনবর জন্মদিন...
নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে জল পড়ে ফোনের স্ক্রিনটা ভিজে গেল। নিজেকে আটকাতে পারবে না জেনে ফোনটা সুইচ অফ করে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু ও জানে, ঘুম আজকে আর ধরা দেবে না। আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে। নিজের অজান্তেই কখন ঘুম আসে, গর্বিতা নিজেও জানে না।
পরের দিন যথারীতি অ্যাপটি আবার অন করল। অণু নামে একটি ছেলের প্রোফাইল এল। বেশ ভালোই মনে হয়েছিল। পাশে গর্বিতার দিদি একটু মজার সাথেই বলল, "এ তো কেমন একটা..."
বলার ধরনটা দেখেই মনে হবে, সেই ছেলেটা যেন কোনো তাচ্ছিল্যের বস্তু... দুই বোনই হেসে উঠল।
গর্বিতা বলল, "থাক না, বেচারার হয়তো দেখ, একটাও ম্যাচ হয়নি। আমি না হয় আশার কিরণ দেখাই..." বলেই রাইট swipe করল।
যথাযথ সঙ্গে সঙ্গেই নোটিফিকেশন এল, 'It's a match...'
দুজনেরই হাসির ঝড় নামল....! এই ভেবে যে, বেচারা হয়তো নোটিফিকেশন দেখে হার্ট অ্যাটাক না আসে।
রাত্রি তখন 8.30।
সারাদিন অনেকবার ভেবেছে, একটা মেসেজ করবে কি করবে না। কিন্তু এবার গর্বিতা নিজেকে প্রমিস করেছে। কিছুতেই সে নিজেকে দেওয়া কথা ভাঙবে না। ট্যানট্যানে মেসেজ আসছে অনেক, কিন্তু কিছুতেই মন বসছে না। কথা বলতে ভালো লাগছে না। ঠিক সেই মুহূর্তেই অণুর মেসেজ এল...
অণু- Hi
গর্বিতা- Hello
অণু- কেমন আছো?
গর্বিতা- ভালো আছি। তুমি?
অণু- আমিও ভালো।
অণু- কোথায় থাকো?
গর্বিতা- বাড়িতে..!
বেশ মজা পাচ্ছিল গর্বিতা। ভালোই লাগছিল কথা বলতে। অণুর ভালো নাম ছিল অণুগত রায়। ছোট্ট থেকেই রায় পদবীর উপর আলাদাই ভালোবাসা ছিল গর্বিতার।
কথা এগোতে থাকে। প্রায় রাত ১২.৩০ পর্যন্ত কথা চলতে থাকে। হঠাৎ গর্বিতা ফোনের স্ক্রিন দেখে আর নিজেই অণুগতকে থ্যাঙ্কস জানায়।
জানে ও কী হতে চলেছে ওর সাথে। কোনো ভালো কিছু অপেক্ষা করছে নাকি? নাকি এই পুরাতনকে ভোলার জন্য নতুনের উপর নির্ভর হওয়া ওকে আরও কঠিনের দিকে নিয়ে যাবে?
অল্প দিনেই গর্বিতা আর অণুগত খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেল। তাদের ভালো লাগা, খারাপ লাগা একে অপরের সাথে ভাগ করে নিল। অনুগত পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ছিল। প্রায় বছর চারেকের বড়ো ছিল গর্বিতার থেকে।
গর্বিতার না বলাতেই সব কেমন যেন বুঝে যেত। গর্বিতা যতটা ছেলেমানুষ ছিল, ঠিক ততটাই ম্যাচুরিটি ছিল অণুগতের মধ্যে।
বেশ লম্বা। চোখগুলো স্থির... কিন্তু চোখগুলো যেন কথা বলে দেয়। গায়ের রং বেশ ফর্সা। আর মুখ দেখেই মনে হবে যেন সারা পৃথিবীকে জয় করতে পারবে—এমন আত্মবিশ্বাস অটুট।
১৮ জুলাই দিয়ার জন্মদিন ছিল। দিয়া অনুগতের প্রাক্তন।
সেই দিন অণুগত রাত্রি ১১.৩০টায় গর্বিতাকে ফোন করেছিল। হঠাৎ এই সময়ে অনুগতের ফোন পেয়ে একটু অবাকই হয়েছিল। অনেকক্ষণ প্রায় কথা বলল।
গর্বিতা বুঝতে পারল যে অনুগতের মন ভালো নেই। তখন অনুগত বলল তার প্রাক্তনের কথা। গর্বিতা নিজের মনেই হাসছে আর ভাবছে যে দুটো ভাঙা মন তাদের হৃদয়কে আবার সারানোর জন্যই যথাযথ চেষ্টা করছে!
(ওরা জানে না যে একজনের অনুপস্থিতি আরেকজন কখনোই পূরণ করতে পারে না।)
ভাবতে ভাবতেই ঘড়ির কাঁটা জানান দিল, রাত্রি দুটো বাজে। অনুগত যেন নিজের দুর্বলতা গর্বিতাকে জানিয়ে দায়মুক্ত হল।
অনুগত অনেকবার জানতে চেয়েছে গর্বিতা কেন এই ডেটিং অ্যাপে এসেছে। ঠিক ততবারই কিছু না কিছু বলে কথা এড়িয়ে গেছে।
অণুগত গর্বিতাকে ভালোবেসে ফেলল। নিজের মনের কথা গর্বিতাকে বলল। কিন্তু গর্বিতা বুঝতে পারল না, কী করে এত তাড়াতাড়ি না দেখে ভালোবাসা হয়।
নিজেকে বোঝাতে লাগল, অণুগত খুব ভালো ছেলে। ওকে যথেষ্ট বোঝে। তবুও ওর মন বুঝতে চাইছে না। বারবার অভিনবর কথা মনে পড়ছে। ওর মুখ চোখে ভাসছে, আর অভিনব যেন বলছে, "কী রে, তুই না আমাকে ভালোবাসতিস! তোর ভালোবাসা এখন কোথায়? অনেক তো বলেছিস, কখনো আমাকে ভুলবি না। আমি তো জানতাম, তুই কখনো কমিটমেন্ট দিতে পারবি না। দেখলি তো, গর্বিতা, আমি ঠিকই ছিলাম।"
তখনই গর্বিতার মেসেঞ্জারে কলটা এল। অণুগত রায়।
ফোনটা ধরেই বলল, "অণুগত... আমি! আমি এখনো অভিনবকে ভালোবাসি! আই অ্যাম সরি! প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও! তোমাকে এইসব কিছু অনেক আগে বলা উচিত ছিল, কিন্তু আমি বলতে পারিনি।"
সব কিছু বলতে শুরু করল। কী করে ক্লাস ইলেভেনে অভিনবর প্রেমে পড়েছিল। সেই এগারো টাকার এসএমএস প্যাকে তাদের কথা হতো। একসাথে মাঝে মাঝে পড়তে যাওয়া, নিজের অজান্তেই একই রঙের জামা পড়া, বান্ধবীদের গুঞ্জন, আর সাহস করেই ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রোপোজ করা, আর কীভাবে রিজেক্ট করেছে—সব বলতে বলতেই কান্না করে দিল।
অণুগত বলল, "এখনো ভালোবাসো? এত দিন পরেও কোনো ভবিষ্যৎ নেই জেনেও?"
গর্বিতা চুপ করে রইল। কারণ ও জানে, অণুগত যা বলছে তা কঠিন হলেও তাই-ই সত্যি। এত বছরেও অভিনব এক দিনের জন্যও ওকে এমন কিছু বলেনি বা খোঁজ নেয়নি। প্রোপোজ করার আগের দিনও তো ওরা বন্ধু ছিল। কিন্তু ও তো বন্ধুত্বের জন্যও ওর খোঁজ নেয়নি।
পরিস্থিতি সামলানোর জন্য অণুগত বলল, "ঠিক আছে, সেই সব না হয় থাক... একটা গান করি, শোনো... অনেক প্র্যাকটিস করেছি।"
গর্বিতা জানে, ওকে হাসানোর জন্যই এত কিছু।
কয়েক দিন পর ওরা ঠিক করল, দুজন এবার দেখা করবে। যথাযথভাবে ডেট আর সময় ঠিক হলো।
৫ আগস্ট গর্বিতা খুব সাধারণভাবেই গেল। উত্তেজনা নেই তেমন। প্রথম দেখা করবে, তেমন কোনো এক্সাইটমেন্ট নেই ওর মনে। কিন্তু উল্টো দিকে অণুগতের উৎসাহ তুঙ্গে। ডেনিমের শার্ট আর ব্ল্যাক জিন্স পরেছে। একটু বেশিই নিজেকে গুছিয়ে এনেছে।
অণুগত গর্বিতাকে ফোন করল কোথায় আছে জানানোর জন্য। আর ও কী রঙের ড্রেস পরেছে, তারই বিশ্লেষণ করতে করতেই... দুজন দুজনের মুখোমুখি।
অণুগত গর্বিতাকে দেখে নিজেকে যেন কোথায় হারিয়ে ফেলল। দমদম স্টেশনের কোলাহল যেন অণুগতকে ছুঁতে পারছে না। সে যেন গর্বিতার ওই কালো হরিণ চোখে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে।
কালো-বাদামি ঢেউ খেলানো চুল, শ্যামবর্ণ, নিষ্পাপ হাসি মুখে লেগে আছে। উচ্চতা মাঝারি। ভগবান সময় রেখেই বানিয়েছে। মুখটা দেখেই মনে হচ্ছে খুব ক্লান্ত। তবে ঠোঁটের কোণে হাসিটা লেগেই আছে।
অণুগত যেমন ভেবেছে, তার থেকে একটু বেশিই সুন্দর গর্বিতা। ছবিতে দেখেছে, তবে সামনাসামনি একটু বেশিই ভালো লাগছে যেন।
অণুগতের ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে গর্বিতা বলল, "হাই! অনেকক্ষণ ওয়েট করতে হল, সরি!!"
অণুগত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "না না, ঠিক আছে।"
কিছুক্ষণ কথা বলল গর্বিতা। মনপ্রাণ দিয়ে চাইল অভিনবকে ভুলতে। কিন্তু কিছুতেই যেন সে নিজের সঙ্গে যুদ্ধে পেরে উঠছে না। আপ্রাণ চেষ্টা করছে। অণুগত বুঝতে পারল গর্বিতাকে দেখে। তখন অণুগত আর কিছু বলল না।
বাড়ি এল অণুগত। ফোন করল গর্বিতাকে। আর বলল, "শেষ থেকে শুরু করাটা বড্ড কঠিন, গর্বিতা। সবাই পারে না। আর তুমি তো শেষই করতে পারলে না, তো শুরু করবে কী করে?"
গর্বিতা নিজের উত্তর পেয়ে গেল। প্রশ্ন না করেই তার নিজের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হল। সে বুঝতে পেরেছে, পুরোনোকে যদি নিজে ভুলতে না পারে, তাহলে কখনোই অন্য কেউ ভোলাতে পারে না।
অণুগতকে বাই বলল। জানে না, ও ঠিক করেছে কিনা! গর্বিতা জানত যে অণুগত সত্যিই ওকে ভালোবাসে, সব কিছু জেনে-শুনেই। গর্বিতা নিজের সঙ্গে আর আপস করতে রাজি নয়। গর্বিতা জানে, ও যেখানে ভালোবাসা খুঁজছে, সেখানে ও কখনো ওর প্রাপ্য ভালোবাসা পাবে না।
তবে ও আর জানাতে যাবে না। শুধু ডেস্টিনিতে বিশ্বাস করে আছে। যা হবে, ভালোই হবে।
(দেরিতে হলেও গর্বিতা বুঝেছে, সব সময় পুরাতনকে ভুলতে নতুনের আগমন যথেষ্ট নয়। অনেক সময় হয়, কিন্তু গর্বিতার ক্ষেত্রে তা হয়নি। অণুগত আর গর্বিতা এখন শুধু বন্ধু। মাঝে মাঝে অভিনবর সাথে দেখা হয়। কথা আর হয় না আগের মতো। আর খারাপ লাগে না। তবে ভালোবাসা এখনো আছে, আর হয়তো থেকে যাবে। প্রথম ভালোবাসা কখনো ভোলা যায় না। আর যারা ভুলে যায়, তারা হয়তো মন দিয়ে ভালোবাসে না।)